ক্রিকেটার থেকে ডক্টর অব স্পোর্টস: তিন দশকের অভিজ্ঞতায় বিসিবিতে ফিরলেন সিরাজউদ্দিন আলমগীর

ক্রীড়া প্রতিবেদক

২৭ মে ২০২৬, ০৪:০৩ অপরাহ্ন

ক্রিকেটার থেকে ডক্টর অব স্পোর্টস: তিন দশকের অভিজ্ঞতায় বিসিবিতে ফিরলেন সিরাজউদ্দিন আলমগীর

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এক প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর উৎসবমুখর পরিবেশে পর্ষদ গঠনে ভোট ও প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন প্রার্থীরা। এর মধ্যেই ক্যাটাগরি-৩ (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক অধিনায়ক ও সংস্থা) থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর।

তবে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি নেতিবাচক আলোচনাও ডালপালা মেলছে, বিসিবির বর্তমান অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল খানের সাথে তার পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। এই যোগসূত্রকে সামনে এনে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, 'আত্মীয়তার সুবাদে' বা 'অ্যাডভান্টেজ' নিয়ে তিনি বোর্ডে আসছেন।

কিন্তু সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরের সুবিশাল এবং সমৃদ্ধ ক্রিকেটীয় ব্যাকগ্রাউন্ড ও দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তার রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে যেকোনো নিরপেক্ষ মানুষের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, তিনি কেবল যোগ্যই নন বরং বিসিবির পরিচালক পদের জন্য অন্যতম ওভার-কোয়ালিফাইড বা অতি-যোগ্য একজন ব্যক্তিত্ব। কোনো আত্মীয়তার পরিচয় দিয়ে নয় বরং নিজের যোগ্যতার ভারেই তিনি এই পদে আসীন হচ্ছেন।

আত্মীয়তা বনাম ক্রিকেটীয় ঐতিহ্য:

চলতি আলোচনায় যখন সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরকে তামিম ইকবালের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন ইতিহাসের একটি বড় সত্যকে আড়াল করা হয়। তামিম ইকবাল যখন ক্রিকেটে হাঁটি হাঁটি পা পা করছেন, কিংবা বাংলাদেশ জাতীয় দলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তার অনেক আগে থেকেই সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের এক চেনা মুখ, মাঠ কাঁপানো ক্রিকেটার এবং সুপরিচিত নীতিনির্ধারক।

১৯৯৬ সালে তিনি যখন প্রথমবার বিসিবির কাউন্সিলর হন, তখন তামিম ইকবালের বয়স মাত্র ৮ বছর! ২০০৫ সালে যখন তিনি প্রথমবার বিসিবির পরিচালক নির্বাচিত হন, তখনও তামিম ইকবালের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকই ঘটেনি। ফলে, আত্মীয়তার সুবাদে তিনি ক্রিকেট বোর্ডে স্থান পাচ্ছেন, এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবান্তর।

মাঠ কাঁপানো ক্রিকেটার: বর্ণাঢ্য খেলোয়াড়ি ব্যাকগ্রাউন্ড

সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর কেবল এসি রুমে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনো তাত্ত্বিক সংগঠক নন; তিনি নিজে মাঠের এক দুর্দান্ত লড়াকু সৈনিক ছিলেন। তার খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়:

- রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্স (স্টার যুব ক্রিকেট): ১৯৮৭-১৯৮৮ মৌসুমে তৎকালীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট 'স্টার যুব ক্রিকেট'-এ অপরাজিত ১৩৩ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন, যা টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর হিসেবে রেকর্ডভুক্ত ছিল।

- চট্টগ্রাম ক্রিকেট লিগ: ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত টানা ৭ বছর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দল 'শতদল ক্লাব' ও 'ইয়ং স্টার ক্লাব'-এর হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন।

- চাটগাঁর ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অনন্য রেকর্ড: চট্টগ্রাম মহানগরী ক্রিকেট টুর্নামেন্টে শতদল ক্লাব, ফ্রেন্ডস ক্লাব ও শহীদ শাহজাহান সংঘের হয়ে খেলার সময় তিনি অপরাজিত ১৫৫ রানের এক দানবীয় ইনিংস খেলেন। একই টুর্নামেন্টে আফজাল খানের সাথে তার গড়ে তোলা ২৭৫ রানের অপরাজিত পার্টনারশিপ টুর্নামেন্টের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ছিল।

- ঢাকা ও জাতীয় লিগের নিয়মিত মুখ: ১৯৮৯-১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা মিলনার্স ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেট লিগে বাংলাদেশ রেলওয়ে ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেন। পাশাপাশি ১৯৯০-১৯৯১ মৌসুমে দেশের তৎকালীন সর্বোচ্চ স্তরের টুর্নামেন্ট 'জাতীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ'-এ বাংলাদেশ রেলওয়ের হয়ে এবং পরবর্তীতে রাজশাহী ক্রিকেট লিগে (১৯৯২) নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।

- বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট: ১৯৯১-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে ইন্টার ইউনিভার্সিটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে নিয়মিত দলের অপরিহার্য সদস্য ছিলেন।

সংগঠক হিসেবে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার: বিসিবিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

ক্রিকেট ছাড়ার পর তিনি দেশের ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে নিতে দক্ষ দূরদর্শী সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিসিবিতে এটি তার প্রথম পদচারণা নয়, বরং এটি তার গৌরবময় ঘরে ফেরা।

- বিসিবির সাবেক পরিচালক (২০০৪-২০১২): তিনি ২০০৪ থেকে ২০০৭ এবং ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে সাফল্যের সাথে বিসিবির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

- ভেন্যু চেয়ারম্যান (চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম): ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের ভেন্যু চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তার নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ সফর, ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কার সফর এবং সবচেয়ে বড় কথা, ২০১১ সালের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ-এর ভেন্যু চেয়ারম্যান হিসেবে প্রশংসা কুড়ান তিনি।

- বিপিএলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব: বাংলাদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (BPL T20) যখন ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে, তখন ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এর 'ফাউন্ডার মেম্বার সেক্রেটারি' বা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুরো টুর্নামেন্টের সফল কাঠামো দাঁড় করানোর নেপথ্য কারিগর ছিলেন এই সিরাজউদ্দিন আলমগীর।

- বিসিবির ডিসিপ্লিনারি কমিটির চেয়ারম্যান: ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি বোর্ডের শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান হিসেবে কাজ করে ক্রিকেটের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে আপসহীন ভূমিকা পালন করেন।

আন্তর্জাতিক জাতীয় স্তরে সাংগঠনিক দক্ষতা

সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরের সাংগঠনিক দক্ষতার পরিধি কেবল ক্রিকেটের চার ছক্কার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বহুমুখী একজন নেতৃত্বদানকারী:

- চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা (CDSA): ২০০৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে অত্যন্ত সুনামের সাথে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

- বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA): ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য এবং অডিট ও ফাইন্যান্স কমিটির মেম্বার সেক্রেটারি হিসেবে দেশের সামগ্রিক ক্রীড়াখাতে অবদান রেখেছেন।

- আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি: ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত 'ইসলামিক স্পোর্টস সলিডারিটি ফেডারেশন'-এ বাংলাদেশের কাউন্সিলর ও কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

- সফল টিম ম্যানেজার ও ডেলিগেট: ২০১১ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর এবং ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের 'হেড অফ ডেলিগেট' বা দলনেতা ছিলেন তিনি। এ ছাড়াও ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দল এবং ২০০০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত জাতীয় ক্রিকেট লিগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলের সফল ম্যানেজার ছিলেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা: একজন 'ডক্টর অব স্পোর্টস'

আমাদের দেশের অনেক ক্রীড়া সংগঠকেরই প্রাতিষ্ঠানিক ক্রীড়া শিক্ষার অভাব দেখা যায়, কিন্তু সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর এক্ষেত্রে এক অনন্য ব্যতিক্রম। তিনি শিক্ষাগত ও তাত্ত্বিকভাবেও ক্রীড়াবিদ্যায় সর্বোচ্চ শিক্ষিত:

- তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (অনার্স) এবং এমএ (প্রথম শ্রেণী) ডিগ্রি লাভ করেন।

ক্রীড়া বিজ্ঞানে তার গভীর আগ্রহের কারণে তিনি ব্যাচেলর অব ফিজিক্যাল এডুকেশন (B.P.Ed) ডিগ্রি অর্জন করেন।

- ভারতের চেন্নাই থেকে ক্রীড়া ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মানসূচক 'ডক্টরেট ডিগ্রি ইন স্পোর্টস' (Doctor of Sports) প্রদান করা হয়।

- চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক তাকে ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মর্যাদাপূর্ণ 'একুশে পদক' প্রদান করা হয়।

- পেশাগত জীবনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর এবং গেস্ট টিচার হিসেবে নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াবিদ তৈরিতে সরাসরি যুক্ত।

সম্পর্ক নয়, যোগ্যতাই শেষ কথা

একজন মানুষের ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তৈরি করা ক্যারিয়ার, ক্রিকেটার হিসেবে রেকর্ড বইয়ে নাম, আইসিসি বিশ্বকাপ ভেন্যু পরিচালনার অভিজ্ঞতা, বিপিএলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ভূমিকা এবং ক্রীড়া বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রির মতো বিশাল অর্জনকে শুধুমাত্র "কারও আত্মীয়" তকমা দিয়ে ছোট করার চেষ্টা করা অনভিপ্রেত ও সংকীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

বরং সত্যটি হলো, বিসিবির মতো একটি কর্পোরেট ও পেশাদার ক্রিকেট বোর্ডে সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরের মতো শতভাগ ক্রিকেটীয় ব্যাকগ্রাউন্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসম্পন্ন ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের অন্তর্ভুক্তি দেশের ক্রিকেটের জন্য সুখবর। ১৪ বছর পর বোর্ড ডিরেক্টর হিসেবে তার এই প্রত্যাবর্তন দেশের ক্রিকেট কাঠামোকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং গতিশীল করবে, এটাই ক্রীড়াসংশ্লিস্ট সকলের একমাত্র প্রত্যাশা।

 


সর্বশেষ

উপরে নিয়ে চলুন